ঢাকা, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬
সারাদেশ

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’ - স্বামী হারিয়ে দিশেহারা সুমাইয়ার বুকফাটা আহাজারি

প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’ - স্বামী হারিয়ে দিশেহারা সুমাইয়ার বুকফাটা আহাজারি

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’ - স্বামী হারিয়ে দিশেহারা সুমাইয়ার বুকফাটা আহাজারি

‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’ - এভাবেই বুক চাপড়ে বিলাপ করছিলেন সুমাইয়া আক্তার। চার বছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সেনাসদস্য তিতাস শেখকে। স্বপ্ন ছিল, আগামী ডিসেম্বর মাসে স্বামীর কর্মস্থলে গিয়ে একসঙ্গে নতুন করে সংসার সাজাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। কক্সবাজারের টেকনাফে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন স্বামী তিতাস। স্বামীর নিথর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন সুমাইয়া। তাঁর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। স্বজনদের চোখেও তখন অশ্রুর বন্যা।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে তিতাস শেখের মরদেহ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ, স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারসহ আত্মীয়স্বজনের কান্নায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো গ্রামে। প্রিয় সন্তান, স্বামী ও স্বজনকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষ।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন তিতাস। দাম্পত্য জীবনের নানা স্বপ্ন ছিল তাঁদের। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কারণে দীর্ঘ সময় স্ত্রীকে কাছে রাখতে পারেননি তিনি। পরিকল্পনা ছিল, আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হওয়ার আগেই চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিতাস।

নিহত তিতাস শেখ (২৭) ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর বাবা আফজাল শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। ছোট ভাই আকাশ হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। একই পরিবারের দুই প্রজন্মের সেনাসদস্যের মধ্যে একজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকাহত পুরো পরিবার।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কক্সবাজারের টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার দুর্গম পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে সেনাসদস্য তিতাস শেখ বাঁ কাঁধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিতাসের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর মা রেখা বেগম। সন্তানের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি বারবার মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। সেদিন তিতাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’

মায়ের কাছে ছেলের এটিই ছিল শেষ কথা। কিন্তু সেই অভিযানে যাওয়ার পর আর মায়ের কাছে ফিরে আসেননি তিতাস। ছেলের মুখে বলা শেষ কথাগুলোই এখন বারবার কানে বাজছে তাঁর। সন্তান হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ বাবা আফজাল শেখও। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে শুধু চোখের পানি ফেলছেন তিনি।

শুক্রবার বিকেল পৌনে ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ ফরিদপুরের নগরকান্দা মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে আনা হয়। সেখানে পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ আরই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে। পরে বিকেল ৫টার দিকে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় লস্করদিয়া ইউনিয়নের আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।

সেখানে বাদ মাগরিব জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে তিতাসের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার, নগরকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ এলাকার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বক্তব্য দেন। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই সেনাসদস্যের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

জানাজা শেষে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে তিতাসের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের নিজ বাড়িতে। সেখানে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখতে ভিড় করেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা। কফিনের পাশে স্ত্রী সুমাইয়ার কান্না আর মায়ের বুকফাটা আহাজারিতে উপস্থিত কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। যে মানুষটির সঙ্গে বাকি জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন সুমাইয়া, সেই মানুষটিকে বিদায় জানাতে হবে-এ বাস্তবতা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।

পরে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে তাঁর নানির কবরের পাশে তিতাস শেখকে দাফন করা হয়। দাফন শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তাঁর সমাধিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় সাতজন সৈনিক তিন দফায় মোট ২১টি গুলি ছুড়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই সেনাসদস্যকে শেষ বিদায় জানান।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুক্রবার বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দায় আনা হয়। পরে স্থানীয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লস্করদিয়া গ্রামের কবরস্থানে নানির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

একটি অভিযানে যাওয়ার আগে মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন তিতাস। কথা ছিল, দায়িত্ব পালন শেষে আবার ফিরবেন। স্ত্রীকে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নও ছিল তাঁর। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। ডিসেম্বরের অপেক্ষায় থাকা সুমাইয়ার জীবনে নেমে এলো চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ। স্বামীর কবরের পাশে পড়ে রইল চার বছরের সংসারের অসংখ্য স্মৃতি আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার অপূর্ণ স্বপ্ন।

শেয়ার করুন