ঢাকা, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
সারাদেশ

শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল হত্যার ২৬ বছরেও বিচার মেলেনি, শ্রদ্ধা-স্মরণে যশোরজুড়ে নানা কর্মসূচি

প্রতিনিধি

শহিদুজজামান উজ্জ্বল:

১৭ জুলাই, ২০২৬
শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল হত্যার ২৬ বছরেও বিচার মেলেনি, শ্রদ্ধা-স্মরণে যশোরজুড়ে নানা কর্মসূচি

শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল হত্যার ২৬ বছরেও বিচার মেলেনি, শ্রদ্ধা-স্মরণে যশোরজুড়ে নানা কর্মসূচি

সত্যের পক্ষে আপসহীন অবস্থান আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক কলমের জন্য জীবন দিতে হয়েছিল তাঁকে। ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতের আততায়ীর বুলেটে স্তব্ধ হয়ে যায় দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর প্রতিনিধি শামসুর রহমান কেবলের কণ্ঠ। কিন্তু ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও থেমে থাকেনি তাঁর আদর্শের পথচলা। আজও তিনি যশোরের সাংবাদিক সমাজে সাহস, সততা ও পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তবে দীর্ঘ এই সময়েও বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা আরও গভীর হয়েছে নিহতের পরিবার এবং সাংবাদিক মহলে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবলের ২৬তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে যশোরে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর জন্মস্থান শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের শালকোনা গ্রামেও স্থানীয়ভাবে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

দিনের শুরুতে যশোর প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে সাংবাদিকরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন। পরে একটি শোক শোভাযাত্রা শহর প্রদক্ষিণ করে কারবালা কবরস্থানে গিয়ে শহীদ সাংবাদিকের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

প্রেসক্লাব যশোর, যশোর সংবাদপত্র পরিষদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে), সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন, দৈনিক স্পন্দন পরিবার, রাতদিন নিউজ পরিবারসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন পৃথকভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রেসক্লাবের আর এম সাইফুল আলম মুকুল মিলনায়তনে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম তৌহিদুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি ও যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ-দৌলা, সংবাদপত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওহাবুজ্জামান ঝন্টু, সহ-সভাপতি শেখ দিনু আহমেদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি সাজেদ রহমান বকুল, সাংবাদিক নেতা নূর ইসলামসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

পরে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল শুধু একজন সংবাদকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে আপসহীন এক সংগ্রামী মানুষ। তাঁর হত্যার বিচার সম্পন্ন না হওয়া দেশের বিচারব্যবস্থা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।

স্মরণসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ-দৌলা, মবিনুল ইসলাম মবিন, ওহাবুজ্জামান ঝন্টু, এস এম তৌহিদুর রহমান, হারুন অর রশিদ, আমিনুর রহমান মামুন, সাজ্জাদ গনি খান রিমন, ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল, মনোতোষ বসু, এইচ আর তুহিন ও মনিরুজ্জামান মুনির। সভা পরিচালনা করেন জেইউজের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন। এছাড়া মাহাবুব আলম লাবলু, মিজানুর রহমান মুন, আকরামুজ্জামান, শহিদ জয়সহ বিভিন্ন সাংবাদিক নেতা কর্মসূচিতে অংশ নেন।

এদিকে, শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরির উদ্যোগে নিজস্ব কার্যালয়ে শহীদ সাংবাদিকের স্মরণে বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্থানীয় সাংবাদিক, শিক্ষক, সুধীজন ও গ্রামবাসী তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

শামসুর রহমান কেবল যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের শালকোনা গ্রামের সন্তান। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সুদের কারবার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে ২০০০ সালের ১৬ জুলাই রাতে জনকণ্ঠের যশোর অফিসে আততায়ীদের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন।

মামলার চার্জশিটে ১৬ জনকে আসামি করা হলেও বিচার আজও শেষ হয়নি। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী মুশফিকুর রহমান হিরক এখনও পলাতক। অপর আসামি আসাদুজ্জামান লিটু র‌্যাবের ক্রসফায়ারে, নাসির উদ্দিন কালু হৃদরোগে এবং আনারুল প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন। বাকি অধিকাংশ আসামি জামিনে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিচার কার্যক্রম নানা আইনি জটিলতায় স্থবির থাকায় পরিবার ও সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবলের ২৬তম শাহাদাতবার্ষিকীতে বক্তারা অবিলম্বে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

তাঁদের ভাষায়, "সত্যের কণ্ঠকে গুলি করে স্তব্ধ করা গেলেও সত্যকে কখনো হত্যা করা যায় না। শামসুর রহমান কেবল তাঁর সাহসী সাংবাদিকতা, সততা ও আদর্শের মধ্য দিয়েই আজও মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।"

শেয়ার করুন