ঢাকা, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
সারাদেশ

রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা, হামলায় অংশ নেয় ৬ জন

প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

১৪ জুন, ২০২৬
রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা, হামলায় অংশ নেয় ৬ জন

রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যা

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৫) হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে অন্তত ছয়জন সশস্ত্র ব্যক্তি অংশ নেয় এবং তাদের মধ্যে দুজন খুব কাছ থেকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

শনিবার (১৩ জুন) দুপুর দেড়টার দিকে পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের আশরাফিয়া ফার্মেসির সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মাসুদ রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেতাগী ইউনিয়ন থেকে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবেও আলোচনায় ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে ওষুধ কিনতে আশরাফিয়া ফার্মেসিতে গেলে হঠাৎ করে একটি সশস্ত্র দল তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পরে দুজন অস্ত্রধারী তার খুব কাছে গিয়ে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে একাধিক গুলি করে। এতে মাথা, বুক, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

গুলিবর্ষণের পর হামলাকারীরা দ্রুত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কদলপুরের দিকে পালিয়ে যায়। দিনের বেলায় জনসমাগমপূর্ণ বাজারে এমন হামলার ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন।

খবর পেয়ে রাউজান থানা পুলিশ ও রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

পুলিশের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে হামলার কিছু দৃশ্য ধরা পড়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফুটেজে ছয়জনকে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে পিস্তল ছিল এবং তারা পরিকল্পিতভাবে মাসুদের কাছে গিয়ে গুলি চালায়। হামলাকারীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও পেছনের ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীরা যেখানেই থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”

স্থানীয়দের একাংশের ধারণা, বালুর ব্যবসা, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। যদিও পুলিশ এখনই কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করেনি।

হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে এবং সড়কে যানবাহন আড়াআড়িভাবে রেখে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।

নিহতের বড় ভাই নিজামুল হক চৌধুরী তপন শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ভাইকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। এতদিন নানা নির্যাতন সহ্য করেও বেঁচে ছিল, কিন্তু আজ দিনের আলোতে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।”

এদিকে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, মাসুদ এলাকায় জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। অনেক সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যায় তিনি পাশে দাঁড়াতেন বলেও এলাকাবাসীর বক্তব্য।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর সন্ধ্যার আগেই জনবহুল পাহাড়তলী বাজার প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

শেয়ার করুন