আটবার হাতবদল হওয়া একটি মোবাইল ফোনেই উদ্ঘাটিত হয় মা-ছেলের জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য
প্রতিনিধি
সীমান্তের খবর ডেস্ক:

আটবার হাতবদল হওয়া একটি মোবাইল ফোনেই উদ্ঘাটিত হয় মা-ছেলের জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য- ছবি: প্রতীকী
রাজশাহীর বাগমারায় সংঘটিত আলোচিত মা-ছেলের জোড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল একটি মোবাইল ফোন। হত্যার পর লুট হওয়া সেই ফোনটি একের পর এক আটজনের হাতে ঘুরে বেড়ায়। কখনো ৫০০, কখনো ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ফোনটির সূত্র ধরেই প্রায় এক বছর পর প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
ঘটনাটি ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাতের। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার দেউলা গ্রামে নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন আকলিমা বেওয়া (৫৫) ও তাঁর ছেলে জাহিদ হাসান (২৮)। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। পরদিন নিহত আকলিমার আরেক ছেলে দুলাল উদ্দিন বাগমারা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রথম দিকে মামলাটির তদন্ত করে স্থানীয় থানা পুলিশ। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে তদন্তের একপর্যায়ে জানা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা প্রকৃত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। এতে মামলার তদন্তে স্থবিরতা নেমে আসে।
পরে ২০১৫ সালে মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। তদন্তকারীরা নতুন করে আলামত পর্যালোচনা শুরু করেন এবং নজর দেন হত্যার পর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া আকলিমা বেওয়ার মোবাইল ফোনের দিকে। ওই ফোনটির আইএমইআই নম্বর অনুসরণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।
তদন্তে দেখা যায়, হত্যার পর ফোনটি ঘটনাস্থল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরে তা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি হতে থাকে। আটবার হাতবদল হওয়ার পর ফোনটি নেত্রকোনার এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে পৌঁছায়। ফোনটির ক্রেতা-বিক্রেতাদের শনাক্ত করে একে একে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
পিবিআই জানতে পারে, নিহত আকলিমা বেওয়ার সঙ্গে তাঁর চাচাতো দেবর আবুল হোসেন মাস্টারের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। একই সঙ্গে প্রতিবেশী হাবিবুর রহমানের সঙ্গেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। এসব বিরোধের জের ধরে আকলিমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন আবুল হোসেন মাস্টার ও হাবিবুর রহমান।
তদন্তে আরও উঠে আসে, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়েছিল। ভাড়াটে খুনি সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন হাবিবুর রহমান। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজন ভাড়াটে খুনি আনা হয়।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার দিন রাতে পরিকল্পনাকারী আবুল হোসেন মাস্টার নিজ মোটরসাইকেলে পথ দেখিয়ে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূর থেকে খুনিদের ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। রাত সাড়ে ৮টা থেকে সোয়া ৯টার মধ্যে আকলিমা বেওয়া ও তাঁর ছেলে জাহিদ হাসানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। এ সময় বাইরে আরেক ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে পাহারায় ছিলেন।
হত্যার পর খুনিরা আকলিমার মোবাইল ফোন নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে ফোনটি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি হতে থাকে। সেই হাতবদলের পুরো শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করেই পিবিআই সাতজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পরিকল্পনাকারী আবুল হোসেন মাস্টার ও হাবিবুর রহমানও ছিলেন।
পিবিআইয়ের প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “জোড়া খুনের এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু ছিল একটি মোবাইল ফোন। হত্যার পর ভুক্তভোগীর ফোনটি লুট হয়েছিল। পরে সেটি আটজনের হাতে ঘুরেছে। কিন্তু সেই ফোনের হাতবদলের ধারাবাহিকতা অনুসরণ করেই আমরা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি।”
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে আবুল হোসেন মাস্টার, হাবিবুর রহমান এবং ভাড়াটে খুনিদের নেতা ও বিজিবির চাকরিচ্যুত সদস্য আবদুর রাজ্জাককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী আবদুল্লাহ আল কাফি, রুহুল আমিন, রুস্তম আলী এবং মনিরুল ইসলাম ওরফে মনিরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক তদন্তে প্রযুক্তিগত আলামতের গুরুত্ব কতটা বেশি, বাগমারার এই জোড়া হত্যাকাণ্ড তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একটি মোবাইল ফোনের গতিপথ অনুসরণ করেই শেষ পর্যন্ত উন্মোচিত হয়েছিল বহুদিনের অমীমাংসিত এক জোড়া হত্যার রহস্য।
