ঢাকা, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬
আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভাঙনের শঙ্কা, ইসরায়েল-হেজবুল্লাহ পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে

প্রতিনিধি

সীমান্তের খবর ডেস্ক :

৯ এপ্রিল, ২০২৬
যুদ্ধবিরতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভাঙনের শঙ্কা, ইসরায়েল-হেজবুল্লাহ পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে

বুধবার স্থানীয় সময় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে অন্তত ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এসব হামলায় অন্তত ১৮২ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘোষিত শর্তসাপেক্ষ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর মাত্র একদিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ঘিরে যে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে দিয়ে ইসরায়েল ও লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা

বুধবার স্থানীয় সময় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবাননের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে অন্তত ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। এসব হামলায় অন্তত ১৮২ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, হেজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্র গুদাম ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অভিযানে সন্তোষ প্রকাশ করে এটিকে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের “সবচেয়ে বড় আঘাত” বলে উল্লেখ করেন।

হেজবুল্লাহর পাল্টা জবাব

ইসরায়েলের এই হামলার জবাবে হেজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন অঞ্চলে রকেট নিক্ষেপ করে। গোষ্ঠীটি জানায়, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়েছে।

হেজবুল্লাহর বিবৃতিতে বলা হয়, “লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি-আমেরিকান আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।” এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে, পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি

ইরানও এই পরিস্থিতিতে সরব হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে তারা সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, তেহরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা যুদ্ধবিরতির অন্তত তিনটি শর্ত ইতোমধ্যেই লঙ্ঘিত হয়েছে। তার মতে, এই অবস্থায় যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা বা আলোচনা চালিয়ে যাওয়া “অযৌক্তিক”।

তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি অস্বীকার করে বলেছে, লেবাননের সংঘাত একটি “পৃথক ইস্যু”।

যুদ্ধবিরতির বৈধতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পরে ইরান ও ইসরায়েল তা নিশ্চিত করে এবং পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তবে শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতির শর্ত, পরিধি এবং বাস্তবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতা ছিল। বিশেষ করে লেবানন এই চুক্তির আওতায় পড়বে কি না, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব এখন বড় আকার ধারণ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্পষ্টতাই বর্তমান সংঘাতের অন্যতম কারণ।

মানবিক বিপর্যয় বাড়ছে

গত ছয় সপ্তাহ ধরে চলমান সংঘাতে লেবাননে প্রায় ১,৫০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১৩০ জন শিশু। এছাড়া ১০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন উত্তেজনা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি নিয়েও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এ পথে চলাচল করলে তা ধ্বংস করা হবে।

ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে, প্রণালিটি কার্যত বন্ধ এবং তেলবাহী জাহাজগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস বলছে, প্রণালি খোলা রয়েছে এবং সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি।

এই বিভ্রান্তিকর তথ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সামনে কী?

আগামী ১০ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুদ্ধবিরতির ১০ দফা চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, মাঠপর্যায়ে সহিংসতা বন্ধ না হলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

সার্বিক চিত্র

সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে-মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমেনি, বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা, হেজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ এবং ইরানের হুমকি-সবকিছু মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে এই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধেও রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও। তথ্যসূত্র: বিবিসি।

শেয়ার করুন

যুদ্ধবিরতির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভাঙনের শঙ্কা, ইসরায়েল-হেজবুল্লাহ পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে | সীমান্তের খবর