‘যুদ্ধ এড়াতে আলোচনা’-‘ট্রাম্পের মন্তব্যে বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন’ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শেয়ারবাজার
প্রতিনিধি
সীমান্তের খবর ডেস্ক :

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে টানটান উত্তেজনার মধ্যেই ‘আলোচনার সম্ভাবনা’ সংক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্যে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। একই সঙ্গে কয়েকদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
সোমবার ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘গভীর, বিস্তারিত ও গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে, যেখানে দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার একটি ‘সম্পূর্ণ ও সামগ্রিক সমাধান’ নিয়ে কথা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আলোচনার ইতিবাচক পরিবেশের কারণে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিকল্পনা অন্তত পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই ইরান তা অস্বীকার করে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। একইসঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলতেই এ ধরনের ‘ভিত্তিহীন তথ্য’ প্রচার করা হচ্ছে।
এর আগে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ চালু না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে। পাল্টা হুমকিতে ইরান জানায়, পারস্য উপসাগরে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রতিদিন বিশ্বে সরবরাহ হওয়া প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলেই তার প্রভাব সরাসরি জ্বালানি বাজারে পড়ে।
উত্তেজনা বাড়ার জেরে সোমবার একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যায়। তবে ট্রাম্পের আলোচনাসংক্রান্ত মন্তব্যের পর বাজারে দ্রুত পরিবর্তন আসে এবং দাম নেমে প্রায় ৯৬ ডলারে দাঁড়ায়। পরে কিছুটা বাড়লেও আগের উচ্চ অবস্থানে ফিরে যায়নি।
তেলের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ইউরোপের প্রধান সূচকগুলো দিনের শুরুতে নিম্নমুখী থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ায়। লন্ডনের এফটিএসই-১০০ সূচক প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে। জার্মানির ডিএএক্স সূচক প্রায় ১.২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি সূচক প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্রেও শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ শতাংশের বেশি এবং ডাও জোন্স সূচক প্রায় ১.৪ শতাংশ বেড়ে লেনদেন শেষ করে।
অন্যদিকে, এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যের আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে বড় ধরনের পতন ঘটে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৩.৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক প্রায় ৬.৫ শতাংশ কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এশিয়ার এই দেশগুলো বেশি চাপের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের মন্তব্য বাজারে সাময়িক স্বস্তি আনলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বিনিয়োগ বিশ্লেষক সুজানা স্ট্রিটার মন্তব্য করেন, গত কয়েক সপ্তাহে বারবার আশার সঞ্চার হলেও তা দ্রুত ভেঙে পড়েছে, ফলে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তেলের দাম এখনো তুলনামূলক বেশি থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর ব্যয়চাপ অব্যাহত থাকবে। এছাড়া জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, এটি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের সম্মিলিত রূপ ধারণ করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলো সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং জরুরি বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব সরকারি ঋণ বাজারেও পড়েছে। যুক্তরাজ্যে সরকারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে গেলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর তা কিছুটা কমে এসেছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সামরিক পদক্ষেপ-দুইয়ের ওপরই।
