ঢাকা, বাংলাদেশ || রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সারাদেশ

এক হাতে এলএমজি ও কাঁধে আহত সহযোদ্ধাকে নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জীবনবাজির অমর ইতিহাস স্মরণ

প্রতিনিধি

শহিদুজজামান উজ্জ্বল:

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
এক হাতে এলএমজি ও কাঁধে আহত সহযোদ্ধাকে নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জীবনবাজির অমর ইতিহাস স্মরণ

এক হাতে এলএমজি ও কাঁধে আহত সহযোদ্ধাকে নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের জীবনবাজির অমর ইতিহাস স্মরণ

যথাযোগ্য মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালিত হয়েছে।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ব্যবস্থাপনায় শার্শা উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন কাশিপুরে বীরশ্রেষ্ঠের রণাঙ্গন-সমাধিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবির একটি সুসজ্জিত দল ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে।

এরপর বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর নূর উদ্দিন আহমাদ বীরশ্রেষ্ঠের সমাধিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধানিবেদন করেন। এ সময় বিজিবির সহকারী পরিচালক মাছেদুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা ও সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তবারক বিতরণ করা হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠান শেষে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও পরিচালক লে. কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, “মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখের অসামান্য অবদান ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের প্রেরণার উৎস। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে ও অমর অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বিজিবির পক্ষ থেকে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি পালন করা হয়েছে।”

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানার সীমান্ত সংলগ্ন ছুটিপুর প্রতিরক্ষা ঘাঁটির অনতিদূরে গোয়ালহাটি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এক ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ। সেদিন তিনি চারজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে ছুটিপুর ঘাঁটি এলাকায় ‘স্ট্যান্ডিং প্যাট্রল’ বা টহল দলের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে তাঁদের ঘিরে ফেলে বিরামহীন গোলাবর্ষণ শুরু করে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করে।

যুদ্ধের একপর্যায়ে শত্রুর প্রচণ্ড গুলিতে সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া মারাত্মক আহত হন। দলনেতা নূর মোহাম্মদ নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে দ্রুত এগিয়ে যান এবং এক হাতে এলএমজি চালিয়ে শত্রুকে ঠেকিয়ে রেখে অন্য হাতে আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন। তিনি কাঁধে সহযোদ্ধাকে নিয়েই অনবরত অবস্থান পরিবর্তন করে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়তে থাকেন। এ সময় শত্রুর একটি ২ ইঞ্চি মর্টারের গোলা এসে তাঁর হাঁটুতে লাগলে হাঁটু চুরমার হয়ে যায় এবং ডান কাঁধেও গুলি লাগে।

মারাত্মক ক্ষত ও প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও বীর সেনানী নূর মোহাম্মদ থামেননি। নিজের নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তিনি অপর সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফাকে নির্দেশ দেন আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে। সহযোদ্ধারা পিছিয়ে যেতে না চাইলে তিনি পাশে থাকা একটি গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে অনড় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং নিজের এসএলআর দিয়ে একাই শত্রুর মুখোমুখি হন। সহযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছানো পর্যন্ত তিনি এক হাতে অনবরত গুলি চালিয়ে শত্রুর অগ্রগতি স্তব্ধ করে রাখেন এবং একসময়ে রণাঙ্গনেই শাহাদাত বরণ করেন।

পরবর্তীতে বিকেলের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠিত দল প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে হানাদারদের পিছু হঠাতে বাধ্য করে। পরে একটি ঝোপের আড়াল থেকে নূর মোহাম্মদ শেখের ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ উদ্ধার করে যশোরের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার (বর্তমান নড়াইল জেলা) মহিষখোলা গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আমানত শেখ ও মাতা জেন্নাতুন্নেসা উভয়কেই তিনি শৈশবে হারান। মাত্র ১৩ বছর বয়সে এতিম হয়ে পড়া নূর মোহাম্মদের ঝোঁক ছিল লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

সংসারের চাকা ঘোরাতে ১৯৫২ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন তোতা বিবিকে। অভাবের মুখে প্রথমে মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন (যার সার্ভিস নম্বর ছিল ৯৪৫৯)।

সৈনিক জীবনে তাঁর পারদর্শিতার জন্য তিনি সহকর্মীদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি ‘তকমা-ই-জং’ ও ‘সিতারা-ই-হারব’ মেডেল লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর পেয়ে ছুটি ভোগরত নূর মোহাম্মদ অবিলম্বে স্বদেশের টানে চুয়াডাঙ্গায় ৪ নম্বর ইপিআর উইংয়ে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন বয়রা সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার অধীনে একাধিক দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশনে বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

সহযোদ্ধাদের প্রাণ বাঁচিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করার এই অতুলনীয় সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে।

শেয়ার করুন