যাঁর ঠিকানা ছিল ঘুগনির হাঁড়ি, অথচ আজ তাঁর কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য
প্রতিনিধি
----------------------------------

যাঁর ঠিকানা ছিল ঘুগনির হাঁড়ি, অথচ আজ তাঁর কবিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য
পথের ধারে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। গায়ে ধবধবে সাদা ধুতি-কুর্তা। কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে তেলমাখা লম্বা চুল। কুচকুচে কালো মুখে ঘন গোঁফ, পায়ে কোনো জুতা নেই। সামনে ধোঁয়া ওঠা ঘুগনির হাঁড়ি। পথচারীরা ঘুগনি কিনছেন, কেউ দু-একটি কথা বলছেন, আবার কেউ না তাকিয়েই চলে যাচ্ছেন।
তাঁকে দেখে খুব কম মানুষই বুঝতে পারবেন-এই সাধারণ মানুষটির কবিতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়। তাঁর লেখা স্নাতকোত্তর শ্রেণির পাঠ্য। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁকে দিয়েছেন 'পদ্মশ্রী' সম্মান।
একজন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা মানুষ, অথচ তাঁর সাহিত্য নিয়ে গবেষকরা পিএইচডি করছেন।
তিনি হলেন ভারতের ওড়িশার কিংবদন্তি লোককবি হলধর নাগ-যিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার শিক্ষার সনদ নয়, তার সৃষ্টি।
যে শৈশবের নাম ছিল দারিদ্র্য *
১৯৫০ সালের ৩১ মার্চ। ওড়িশার বড়গড় জেলার ছোট্ট গ্রাম ঘেনসে। সেখানেই জন্ম নেন হলধর নাগ।
জন্মের পর থেকেই দারিদ্র্য যেন তাঁর পরিবারের স্থায়ী সঙ্গী। বয়স যখন মাত্র দশ বছর, তখনই বাবা-মাকে হারান। এত অল্প বয়সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হারিয়ে তিনি হয়ে পড়েন অনাথ।
দারিদ্র্য তাঁকে আর স্কুলে যেতে দেয়নি। তৃতীয় শ্রেণির পর বই-খাতা গুছিয়ে রাখতে হয়েছিল চিরদিনের জন্য।
কিন্তু মানুষটি যে জন্মেছিলেন অন্য এক বিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে-জীবনের বিদ্যালয়ে।
জীবন যখন শিক্ষক *
অভাব মানুষকে অনেক কিছু শেখায়।
কখনো হোটেলে বাসন ধুয়েছেন। কখনো স্কুলের রান্নাঘরে রাঁধুনির কাজ করেছেন। পরে ব্যাংক থেকে অল্প ঋণ নিয়ে একটি ছোট স্টেশনারি দোকান খুলেছিলেন। জীবনের কোনো এক সময় ঘুগনি বিক্রি করেও সংসার চালিয়েছেন।
যে হাত ঘুগনির বাটি বাড়িয়ে দিত, সেই হাতই রাতে লিখে ফেলত কবিতা।
যে মানুষটি দিনে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করতেন, রাত নামলেই তিনি হয়ে উঠতেন শব্দের কারিগর।
গ্রামের ভাষাকেই বানালেন সাহিত্যের ভাষা *
হলধর নাগ লিখেছেন কোসলি (সম্বলপুরি) ভাষায়।
একসময় এই ভাষাকে অনেকেই কেবল আঞ্চলিক কথ্য ভাষা বলে অবহেলা করতেন। কিন্তু হলধর বিশ্বাস করতেন, যে ভাষায় একজন মা সন্তানকে ঘুম পাড়ান, যে ভাষায় কৃষক মাঠে গান গায়, যে ভাষায় গ্রামের মানুষ হাসে-কাঁদে-সেই ভাষাও সাহিত্যের ভাষা হতে পারে।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি লিখলেন 'ধোদো বড়গাছ' (বুড়ো বটগাছ)।
কবিতাটি প্রকাশের পর পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে। জন্ম নেয় এক নতুন কবির।
মহাকাব্যের এক বিস্ময় *
এরপর তিনি থেমে থাকেননি।
একের পর এক লিখেছেন কবিতা, কাব্য, পালাকাব্য এবং প্রায় ২০টি মহাকাব্য।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে-
আচিয়া, বাছার, মহাসতী উর্মিলা, তারা মন্দোদরী, শিরি সামালাই, প্রেম পইচান, বীর সুরেন্দ্র সাই, শান্ত কবি ভিমাভাই, প্রেম কবি গঙ্গাধর-এছাড়াও অসংখ্য কাব্য ও লোকসাহিত্যভিত্তিক রচনা।
তাঁর রচনায় উঠে এসেছে মাটি, মানুষ, নদী, বন, কৃষক, প্রেম, লোকবিশ্বাস, পুরাণ, ইতিহাস এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম।
বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি *
হলধর নাগ সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলোর একটি হলো তাঁর স্মৃতিশক্তি।
নিজের লেখা দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতা ও মহাকাব্য তিনি প্রায় সম্পূর্ণ মুখস্থ আবৃত্তি করতে পারেন।
বই খুলে নয়, স্মৃতির ভাণ্ডার থেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবিতা শুনিয়ে যেতে পারেন।
এ যেন এক চলমান গ্রন্থাগার।
যে মানুষটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য *
এটাই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।
তৃতীয় শ্রেণির পর যার বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেই মানুষটির সাহিত্য আজ সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়।
তাঁর সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। একাধিক গবেষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। আরও অনেকে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ডিগ্রি তাঁর ছিল না।
কিন্তু তাঁর সাহিত্য হয়ে উঠেছে ডিগ্রিধারীদের গবেষণার বিষয়।
পদ্মশ্রী-এক নীরব স্বীকৃতি *
২০১৬ সালে ভারত সরকার সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মশ্রী' প্রদান করে।
পরে ২০১৯ সালে সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার (ডি.লিট.) ডিগ্রিতে ভূষিত করে।
যে মানুষটি কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে পারেননি, সেই মানুষটিকেই বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট দিল।
এ ইতিহাসও খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে।
জীবন বদলায়নি *
পদ্মশ্রী পাওয়ার পরও তাঁর পোশাক বদলায়নি।
আজও সাদা ধুতি, সাদা কুর্তা।
আজও খালি পায়ে হাঁটেন।
আজও গ্রামের মানুষের সঙ্গে গল্প করেন।
আজও অহংকার তাঁর দরজায় কড়া নাড়ে না।
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-জুতা পরেন না কেন?
হেসে তিনি বলেছিলেন,
"খালি পায়ে থাকলে আমি মাটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারি। পৃথিবীর স্পর্শ অনুভব করতে পারি।"
এই উত্তরই যেন তাঁর সমগ্র জীবনের দর্শন।
অনুপ্রেরণা *
হলধর নাগ বলেছেন, কবি বিনোদ নায়কের কবিতা তাঁকে প্রথম সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পরে গঙ্গাধর মেহের ও রাধানাথ রায়ের সাহিত্য থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
তবে তিনি কাউকে অনুকরণ করেননি।
নিজের মাটি, নিজের মানুষ, নিজের ভাষাকেই তিনি নিজের সাহিত্যজগতের কেন্দ্রবিন্দু করেছেন।
ভাষার জন্য সংগ্রাম *
হলধর নাগ শুধু কবি নন।
তিনি কোসলি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরও অন্যতম কণ্ঠস্বর।
তাঁর বিশ্বাস ছিল,
"একটি ভাষা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়।"
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ভাষার জন্যও কলম ধরেছেন।
হলধর নাগের জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়-
দারিদ্র্য মানুষের শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে নয়।
বিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু জ্ঞানের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
ডিগ্রি মানুষকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু সৃষ্টিশীলতা মানুষকে অমর করে।
সমাজ অনেক সময় মানুষের পোশাক দেখে বিচার করে।
কেউ সম্পদ দেখে সম্মান দেয়।
কেউ আবার শিক্ষার সনদ দেখে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে।
কিন্তু ইতিহাসের বিচার ভিন্ন।
ইতিহাস শুধু মনে রাখে, মানুষ পৃথিবীকে কী দিয়ে গেল।
ঘুগনির হাঁড়ির পাশে বসে থাকা সেই সাধারণ মানুষটি আজ কোটি মানুষের প্রেরণা।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন-
প্রতিভা কখনো দারিদ্র্যের কাছে মাথা নত করে না।
স্বপ্ন কখনো বিদ্যালয়ের চার দেয়ালে আটকে থাকে না।
আর সত্যিকারের কবির ঠিকানা কোনো প্রাসাদ নয়-মানুষের হৃদয়।
হলধর নাগ তাই শুধু একজন কবির নাম নয়; তিনি সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং সৃষ্টিশীলতার এক জীবন্ত ইতিহাস।
ইতিহাসের পাতা থেকে
তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও ভাষা সম্পাদনা:
শেখ কাজিম উদ্দিন
সংবাদকর্মী।
